স্থানীয়রা জানান, এনায়েত মুন্সির পারিবারিক আর্থিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল ছিল না। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। তবে আর্থিক সংকট তার গানের স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল তার অন্যরকম ভালোবাসা ও আগ্রহ।
২০ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া এনায়েত মুন্সি সরুশুনা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। পরে সরুশুনা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং লোহাগড়া আদর্শ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।
শৈশবের স্মৃতিচারণ করে এনায়েত মুন্সি জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি গান গাইতেন। স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। এলাকার কোথাও অনুষ্ঠান হলে বড় ভাইয়েরা তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। সেখানে সুযোগ পেলে গান গাইতেন তিনি। দর্শকদের উৎসাহ আর প্রশংসাই ধীরে ধীরে তাকে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।
এভাবেই একসময় গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে গান নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এনায়েত মুন্সি। সংগীতাঙ্গনে নিজের পরিচিতি তৈরি করতে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে অডিশনে অংশ নেন। অডিশনের সেই দিনগুলোতে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সংগীতের সঙ্গে নিজেকে আরও সম্পৃক্ত করেন তিনি।
একপর্যায়ে নিজের একটি অ্যালবাম করার স্বপ্ন দেখেন এনায়েত মুন্সি। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় ২০১০ সালে। সে বছর প্রকাশ করেন একটি অডিও-ভিডিও অ্যালবাম। অ্যালবামটি কয়েকটি জেলায় ভালো সাড়া পেয়েছিল বলে জানান তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুরু হয় দেশের বিভিন্ন জেলায় স্টেজ প্রোগ্রামে গান গাওয়ার ব্যস্ততা।
বছরের পর বছর বিভিন্ন জেলার মঞ্চে গান পরিবেশন করেছেন তিনি। একসময় গানই হয়ে ওঠে তার জীবনের অন্যতম অবলম্বন। তবে জীবনের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না।
এনায়েত মুন্সির ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের একটি ঘটনায় একটি হত্যা মামলায় তিনি আসামি হন। ওই ঘটনার পর দেশে থাকা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি।
প্রবাসের মাটিতেও অবশ্য গানকে ছাড়তে পারেননি এনায়েত মুন্সি। সৌদি আরবেও স্টেজ প্রোগ্রামে গান পরিবেশনের সুযোগ পান। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ আর জীবনের নানা বাস্তবতার মধ্যেও গানকে আঁকড়ে ধরে রাখেন তিনি। এভাবেই কেটে যায় প্রায় ১০ বছর।
দীর্ঘ এক দশক পর আবারও দেশে ফেরেন এনায়েত মুন্সি। দেশে ফিরে যেন ফিরে পান নিজের পুরোনো ঠিকানা—গানের মঞ্চ। আবারও শুরু করেন স্টেজ প্রোগ্রাম। দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে নিজের সেই পুরোনো পথচলাকে নতুন করে এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
এনায়েত মুন্সির গল্প শুধু একজন গায়কের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে থাকার গল্প। ছোটবেলার মঞ্চ থেকে রাজধানীর অডিশন, অ্যালবাম প্রকাশ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেজ, এরপর জীবনের কঠিন বাস্তবতায় প্রবাসের মাটিতে ১০ বছর—দীর্ঘ এই পথ পেরিয়ে আবারও নিজের দেশে ফিরেছেন তিনি।
আজও যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাতে মাইক্রোফোন তুলে গান ধরেন এনায়েত মুন্সি, তখন ফিরে আসে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর স্মৃতি। যে ছেলেটি একদিন বড় ভাইদের হাত ধরে গ্রামের অনুষ্ঠানে গান গাইতে যেত, সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই মানুষটিই আজ আবারও মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের কণ্ঠে ছড়িয়ে দিচ্ছেন গানের সুর।
জীবনের নানা উত্থান-পতন, অভাব-অনটন ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে এনায়েত মুন্সির পথচলা এখনও থামেনি। বরং দীর্ঘ বিরতির পর দেশে ফিরে নতুন উদ্যমে আবারও গানকেই সঙ্গী করে সামনে এগিয়ে যেতে চান তিনি।