মো: ইসরাফিল হোসেন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই একটি দৃশ্য দেখা যায়। কোনো জাতীয় দলের খেলোয়াড় বা শীর্ষ ক্লাবের ফুটবলার খ্যাপ খেলেছেন..ব্যস, শুরু হয়ে যায় বিদ্রুপ, উপহাস আর সমালোচনা। যেন তিনি ভয়াবহ কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন।
কিন্তু একটি প্রশ্ন কি আমরা কখনও নিজেদের করেছি?
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে এমন কতজন খেলোয়াড় আছেন, যারা কখনও খ্যাপ খেলেননি?
উত্তরটি খুবই কঠিন। কারণ বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের প্রায় সব প্রজন্মের অসংখ্য খ্যাতিমান ফুটবলার, জাতীয় দলের তারকা, বড় ক্লাবের অধিনায়ক, কিংবদন্তি খেলোয়াড়, ক্যারিয়ারের কোনো না কোনো সময় খ্যাপ খেলেছেন। তাহলে আজকের খেলোয়াড়দের নিয়ে এত বিস্ময় কেন?
সমালোচনা করতে হলে পুরো ছবিটা দেখতে হবে।
বাংলাদেশে একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার খুব দীর্ঘ নয়। সবাই কোটি টাকার চুক্তিতে খেলেন না। অনেকের আয় মৌসুমি, অনেক সময় বেতন নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে। ক্যারিয়ার শেষ হলে অধিকাংশ খেলোয়াড়ের জন্য কোনো নিশ্চিত পেনশন নেই, নেই আর্থিক নিরাপত্তার শক্ত ভিত্তি। পরিবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, সবকিছুর দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হয়। সেই বাস্তবতায় একটি খ্যাপ ম্যাচ অনেক সময় বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
আরেকটি দিক আছে, যা শহরে বসে অনেকেই বুঝতে চান না।
নিজের জন্মস্থান, নিজের উপজেলা বা গ্রামের মানুষ যখন অনুরোধ করেন..একটা ম্যাচ খেলতে হবে, আপনাকে একবার মাঠে চাই, তখন সেটি শুধু একটি ম্যাচ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে নিজ এলাকার মানুষের ভালোবাসার প্রতি সম্মান। একজন জাতীয় দলের খেলোয়াড় মাঠে নামলে হাজারো শিশু প্রথমবার কাছ থেকে একজন তারকাকে দেখে, ফুটবলকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখে। সেই আনন্দের মূল্যও কম নয়।
অবশ্যই এর ঝুঁকি আছে। চোট লাগতে পারে, ক্লাব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হতে পারে। পেশাদার ফুটবলে এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং খেলোয়াড়দের তা সম্মান করা উচিত। কেউই আইনি বা চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা অমান্য করার পক্ষে থাকতে পারেন না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমস্যার মূল কোথায়?
সমস্যা কি শুধু সেই খেলোয়াড়, যিনি খ্যাপ খেললেন? নাকি সেই ব্যবস্থায়, যেখানে অনেক ফুটবলার এখনো পর্যাপ্ত আর্থিক নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সুবিধা বা সারা বছরের প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ পান না?
আমরা যদি সত্যিই চাই বাংলাদেশের পেশাদার ফুটবলাররা খ্যাপ না খেলুক, তাহলে তাদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে অতিরিক্ত আয়ের জন্য বা সামাজিক চাপের কারণে এই পথে যেতে না হয়। উন্নত চুক্তি, সময়মতো পারিশ্রমিক, বীমা, খেলোয়াড় কল্যাণ তহবিল এবং শক্তিশালী লিগ কাঠামো, এসব নিশ্চিত করাই হবে স্থায়ী সমাধান।
কীবোর্ডের আড়াল থেকে একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে হাসাহাসি করা খুব সহজ। কিন্তু তার জীবনের বাস্তবতা বোঝা অনেক কঠিন।
তাই সমালোচনা করুন, কিন্তু ইতিহাস জেনে করুন। প্রশ্ন তুলুন, কিন্তু প্রেক্ষাপট বুঝে তুলুন। কারণ একজন ফুটবলার শুধু ৯০ মিনিটের খেলোয়াড় নন,তিনি একজন মানুষ, একজন পরিবারের উপার্জনকারী এবং আমাদের ফুটবল সংস্কৃতিরই একটি অংশ।
খ্যাপ খেলার সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। এটি শেষও হবে না শুধু মাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্রুপ করে। এর সমাধান হবে তখনই, যখন বাংলাদেশের ফুটবল এমন একটি পেশাদার কাঠামো গড়ে তুলবে, যেখানে একজন খেলোয়াড়কে আর প্রয়োজনের তাগিদে নয়, শুধুই নিজের স্বপ্নের জন্য ফুটবল খেলতে হবে।