দুইজোড়া পা
বিপ্লব হোসেন
দুইজোড়া পা আমার ভীষণ প্রিয়।
ঐ একজোড়া পা; যে পা আমাকে নিয়ে দশমাস দশদিন সযত্নে বয়ে বেড়িয়েছে এই মাটির উপর।
যে পায়ের উপর পা রেখে এক’পা দু’পা করে আমি হাঁটতে শিখেছিলাম।
ঐ একজোড়া পা; যে পা আমার মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দেওয়ার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটেছে।
এই দুইজোড়া পা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
আমি যতবার পৃথিবীর দিকে তাকিয়েছি, ততবার এই দুইজোড়া পায়ের ছায়া পেয়েছি।
আমি যতবার হোঁচট খেয়েছি
এই দুইজোড়া পা ততবার আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।
একজোড়া পায়ের নিচে ছিল স্নেহমাখা নরম মাটি, অন্য জোড়া পায়ের নিচে ছিল জীবনের সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধ।
একজোড়া পা আমার সমস্ত কান্না বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে, আরেকজোড়া পা নিজের ফোসকা-ভরা তলা হাসিমুখে ধুলোর নিচে চাপা দিয়েছে।
আমি কোনোদিন দেখিনি, ওদের পথের ক্লান্তি।
শুধু দেখেছি; আমার চলার পথ যেন কঠিন না হয়, সেই চেষ্টায় ওদের পায়ের চামড়া ক্ষয়ে গেছে।
আমি যখন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি, তখনও দুইজোড়া পা আমার আগামী জীবন গড়তে নীরবে হেঁটে গেছে।
আমার নতুন জামার ভাঁজে ওদের পুরোনো স্যান্ডেলের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ছিল।
আমার বইয়ের পাতায় ওদের ঘামের গন্ধ শুকিয়ে ফুল হয়ে ফুটেছিল।
আমি মানুষ হয়েছি, কিন্তু মানুষ হওয়ার আগেই দুইজোড়া পা আমাকে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
একদিন বুঝলাম, আমার প্রতিটি সফলতার নিচে দুইজোড়া পদচিহ্ন চাপা পড়ে আছে।
আমি যত উঁচুতেই উঠি, ঐ দুইজোড়া পায়ের ধুলো কখনোই ছুঁতে পারব না।
আমার সমস্ত প্রার্থনা সেই দুইজোড়া পায়ের কাছে ঋণী।
আমার প্রতিটি শ্বাস সেই দুইজোড়া পায়ের অবিরাম ছুটে চলা।
আজও যখন ঘরে ফিরি, দরজার সামনে দুইজোড়া পায়ের অদৃশ্য অপেক্ষা অনুভব করি।
সময় হয়তো একদিন সেই পদচিহ্ন মুছে দিতে চাইবে।
সেদিন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব মানুষ হয়ে যাব।
বাড়ি বলতে আমি কোনো দেয়াল বুঝি না, বাড়ি বলতে আমি বুঝি দুইজোড়া পায়ের শব্দ।
জান্নাত কেমন, আমি জানি না।
তবে জানি, এই পৃথিবীতে যদি কোথাও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঠিকানা থেকে থাকে, তবে তা লুকিয়ে আছে সেই দুইজোড়া পায়ের ধুলোর ভেতর।
আমার সমস্ত অহংকার, সমস্ত অর্জন, সমস্ত পরিচয় একপাশে সরিয়ে রাখলেও এই সত্য কখনও বদলাবে না।
দুইজোড়া পা-ই ছিল আমার প্রথম আশ্রয়, প্রথম সাহস, প্রথম পৃথিবী, আর শেষ পর্যন্ত আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।