
মোঃ ইকরামুল হাসান হৃদয়
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ঝামা বাজারে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঝামা বার্ষিক নৌকা বাইচ মেলা-২০২৬। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আয়োজিত এ প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী। নৌকার ছন্দময় বৈঠার তালে তালে মুখর হয়ে ওঠে নদীর তীর। গ্রামবাংলার চিরচেনা এ আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় আনন্দ-উৎসবের আমেজ।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকা বাইচ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে এ প্রতিযোগিতার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। একসময় গ্রামবাংলার বিভিন্ন নদ-নদীতে নৌকা বাইচ ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যম বিস্তৃত হলেও ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের আকর্ষণ এখনো কমেনি। বরং এ ধরনের আয়োজনকে ঘিরে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ।
সেই ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করার প্রত্যয়ে মহম্মদপুর উপজেলার ঝামা বাজারে অনুষ্ঠিত হয় বার্ষিক নৌকা বাইচ মেলা। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নৌকাগুলো নদীর বুকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ এ প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবব্রতী মিস্ত্রী, অ্যাডভোকেট খান রোকনুজ্জামান এবং মৈমূর আলী মৃধা, সদস্য, মাগুরা জেলা বিএনপি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর মো. রেজাউল করিম।
প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে ঝামা বাজার ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও দর্শনার্থীরা এ আয়োজন দেখতে আসেন। নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সম্প্রীতি ও মিলনমেলার আবহ তৈরি হয়। গ্রামীণ জনপদের মানুষের কাছে এ ধরনের আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার একটি উপলক্ষ।
স্থানীয় ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে নৌকা বাইচ মেলার গুরুত্ব রয়েছে। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশেও এ ধরনের উৎসব ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলার নদী, নৌকা ও মাঝিদের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নৌকা বাইচের ইতিহাস। তাই এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি নদ-নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঐতিহ্যপ্রেমীরা।
সব মিলিয়ে ঝামার বার্ষিক নৌকা বাইচ মেলা-২০২৬ হয়ে উঠেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলার এক প্রাণবন্ত আয়োজন। এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলার সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও নতুন করে তুলে ধরা সম্ভব হবে।